পবিত্র রমজান মাসে ডায়াবেটিস রোগীর চিকিৎসা ও পরামর্শ

রমজান মাস সারাবিশ্বের মুসলিম ভাইদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র মাস। এই মাসে মুসলিমগণ ফযর ওয়াক্ত থেকে মাগরিব পর্যন্ত সব ধরণের খাদ্য-পানীয় থেকে বিরত থাকেন। মহান আল্লাহতাআলার সন্তুষ্টির জন্য এই মাসের সিয়াম সাধনা অন্যান্য মাসের তুলনায় শ্রেষ্ঠ।

আরবী মাস গুলো চাঁদের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাই রমজান মাস কখনও ২৯ দিন আবার কখনও ৩০ দিনের হয়। এ মাসে দিনের ভাগ বিভিন্ন ঋতুতে ও বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন হয় অর্থাৎ ১২ থেকে ২০ ঘণ্টারও বেশী হতে পারে। দিনের ভাগ যতই বেশী হোক না কেন এ মাসে মুসলিমগণ আল্লাহতাআলার বিধানমতো রোজা পালন করেন। এ সময় সব ধরণের পানাহার বন্ধ থাকে এবং ইফতার থেকে শুরু করে সেহেরী পর্যন্ত সময়ে যত ইচ্ছা পানাহার করতে ধর্মীয় ভাবে নিষেধ নেই।

রমজান মাসে মুসলিমগণের খাদ্যাভ্যাসে হঠাৎ করে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ডায়াবেটিস রোগ এবং এর চিকিৎসা যেহেতু খাদ্য গ্রহণের সাথে সম্পর্কযুক্ত, তাই রমজান মাসে ডায়াবেটিস রোগীদের পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাসের সাথে মিলিয়ে চিকিৎসায় বিশেষ পন্থা অবলম্বন করতে হয়।

আমি আজকের লেখায় রমজান মাসে ডায়াবেটিস চিকিৎসা কি হওয়া উচিৎ তা নিয়ে কিছুটা বিশদ আলোচনা করব। আমার এই লেখাটি মূলত চিকিৎসার পটভূমিতে রচিত, তাই এখানে চিকিৎসার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। এই লেখা পরে কেউ নিজে নিজে ঔষধ বা ইনসুলিনের ডোজ পরিবর্তন করবেন না। রোজার আগেই আপনার ডায়াবেটিস চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে মুখে খাওয়ার ঔষধ বা ইনসুলিনের ডোজ পরিবর্তন করবেন।

রোজাদার ডায়াবেটিস রোগীর কিছু ঝুঁকি থাকে, যেমনঃ (ক) হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তের গ্লুকোজ মাত্রাতিরিক্ত কমে যাওয়া), (খ) হাইপারগ্লাইসেমিয়া (রক্তের গ্লুকোজ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া), (গ) ডায়াবেটিক কিটো-এসিডোসিস (মাত্রাতিরিক্ত গ্লুকোজের পাশাপাশি রক্তের কিটো-এসিড বেড়ে যাওয়া, (ঘ) ডিহাইড্রেশন (পানিশুন্যতা)। রমজানের পূর্বেই চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ঔষধ বা ইনসুলিনের ডোজ সমন্বয় করে এই ঝুঁকি সমূহ এড়ানো সম্ভব।

যারা ইনসুলিন নিঃসরন বর্ধক (Secretagogues) ঔষধ সেবন করেন (যেমনঃ গ্লাইবেনক্লামাইড, গ্লিপিজাইড, গ্লিক্লাজাইড, গ্লিমেপিরাইড, রেপাগ্লিনাইড, ন্যাটিগ্লিনাইড) বা ইনসুলিন নেন তারা হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন। তাই রোজার আগেই আপনার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ডোজ পরিবর্তন করে নিন।

যাদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই তারা “রমজানে ডায়াবেটিস কমে যায়” মনে করে ঔষধ বা ইনসুলিন এর ডোজ কমিয়ে দিলে হাইপারগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন। এদের মধ্যে টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের ডায়াবেটিক কিটো-এসিডোসিস দেখা দিতে পারে। যা শেষ পর্যন্ত হাসপাতাল পর্যন্ত গড়াতে পারে। (টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদেরও এটা হতে পারে)

গরম কালে প্রচুর ঘাম হয় এবং গরম কালের রমজানে রোজাদারের পানি শুন্যতা দেখা দিতে পারে। তাই রোজাদার ডায়াবেটিস রোগীরা ইফতারের সময় থেকে সেহেরী পর্যন্ত প্রচুর পানি ও ফলের রস পান করবেন। তবে, যেসব ডায়াবেটিস রোগীর কিডনীর কার্যক্রমে কোন জটিলতা আছে তাদের চিকিৎসকের নির্দেশ মত পানি পান করতে হবে।

রোজার মাসে রোজাদার ডায়াবেটিস রোগীর মুখে খাওয়ার ঔষধ বা ইনসুলিনের ডোজ কমানোর প্রয়োজন হয়। সাধারণ নিয়মে, ঔষধ বা ইনসুলিনের সারাদিনের পরিমান যত হয় মোটামুটিভাবে তার অর্ধেক ইফতারের সময় এবং ৪ ভাগের ১ ভাগ সেহেরীর সময় নিতে হয়। তবে আপনারা নিজে নিজে ডোজ পরিবর্তন করবেন না। রোজার আগেই আপনার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নিন।

সেহরীর খাদ্যঃ যথা সম্ভব দেরীতে সেহেরী গ্রহন করুন। জটিল শর্করা গ্রহন করতে চেষ্টা করুন। যেমনঃ বার্লি, আটার রুটি, জই, সুজি, খেজুর, বাদাম, মটরশুঁটি, ডাল, পাকা কলা এবং আঁশ যুক্ত খাদ্যঃ ভুষি, শস্য ও বীজ, সবুজ শাক-সবজি, কাজু বাদাম ইত্যাদি।

ইফতারের খাদ্যঃ যথা সম্ভব দ্রুত ইফতার করুন। সাধারন খাদ্য গ্রহন করুন। যেমনঃ ভাত বা ভাত জাতীয় খাদ্য, খেজুর, ফলের রস, পানি। বর্জন করুনঃ ভাজা-পোড়া খাদ্য, চর্বি ও তৈলাক্ত খাদ্য, চিনি ও গুড়ের তৈরী খাদ্য, চা, সফট ড্রিঙ্কস ইত্যাদি।

পানি পানঃ ইফতার থেকে সেহেরী পর্যন্ত সময়ে মোটামুটি ৮ গ্লাস বা ২ লিটার পানিই যথেষ্ট। চা, কফি, সফট ড্রিঙ্কস এড়িয়ে চলুন।

হাঁটা ও ব্যায়ামঃ রোজাদার ডায়াবেটিস রোগীর সারাদিন স্বাভাবিক কাজকর্ম ও চলাফেরা করতে কোন বাধা নেই। খুব বেশী ব্যায়াম বা অতিরিক্ত হাঁটা হাইপোগ্লাইসেমিয়া করতে পারে, বিশেষ করে ইফতারের কয়েক ঘন্টা আগে। তাই, যোহরের নামাজের পর থেকে ইফতারের আগে পর্যন্ত অধিক কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করাই ভালো। নিয়মিত তারাবী নামাজ ডায়াবেটিস রোগীর জন্য সারাদিনের হাঁটা ও ব্যায়ামের মতো কাজ করবে।

রক্তের গ্লুকোজ মাপাঃ সারা দিনে কয়েকবার বাসায় গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তের গ্লুকোজ পরিমাপ করুন। যাতে গ্লুকোজের মাত্রা খুব বেশী কমে গেলে বা বেড়ে গেলে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহন করা যায়। বিশেষত যারা টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগী এবং টাইপ ২ রোগীর ক্ষেত্রে যারা ইনসুলিন নেন।

রোজা ভাঙ্গাঃ দিনের যে কোন সময়ে রোজাদার ডায়াবেটিস রোগীর রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা যদি ৩.৫ মিলিমোল/লিটার বা তার নীচে নেমে যায় তাহলে তার রোজা ভেঙ্গে ফেলা উচিৎ। না হলে, মারাত্মক হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন। আবার, সেহেরী খাওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা যদি ৪.০ মিলিমোল/লিটার বা তার নীচে নেমে যায় তাহলে তারও রোজা ভেঙ্গে ফেলা উচিৎ। ঘন ঘন বমি বা পাতলা পায়খানা হলে বা অসুস্থতার সময় রোজা না রাখাই উচিৎ।

যে সব টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীর রক্তের গ্লুকোজ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রন করা যায়নি বা সবসময় বিপজ্জনক মাত্রায় থাকে, তাদের রোজা না রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগী, যারা শুধুমাত্র খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করে গ্লুকোজের মাত্রা সঠিক রাখেন, তাদের রোজা রাখতে কোন বাঁধা নেই।

রোজাদার ডায়াবেটিস রোগীদের রমজানের পূর্বেই কতগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে রাখা উচিৎ। যেমনঃ রোজা রাখা অবস্থায় নিজের যত্ন কিভাবে নিবেন, হাইপোগ্লাইসেমিয়া কি এবং এর উপসর্গ ও চিহ্ন গুলো কি কি, কিভাবে হাইপোগ্লাইসেমিয়া মোকাবিলা করবেন, রক্তের গ্লুকোজ মাপার পদ্ধতি, খাদ্য গ্রহণে কি কি সতর্কতা অবলম্বন করবেন, কি ধরনের ব্যায়াম করবেন, পানি শুন্যতা ইত্যাদি।

চিকিৎসাঃ টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য হিউম্যান ইনসুলিন এর বদলে এনালগ জাতীয় ইনসুলিন গুলো ভালো কাজ করে। দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারে এরূপ ইনসুলিন বাছাই করা উচিৎ, সাথে স্বল্প সময় কাজ করে এরূপ ইনসুলিন এর সমন্বয় হলে আরও ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়। তবে আপনার চিকিৎসক যেটা নির্ধারণ করে দিবেন সেটাই মেনে চলা উচিৎ।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যঃ যারা শুধুমাত্র খাদ্য নিয়ন্ত্রণ এর মাধ্যমে ভালো আছেনঃ তাদের রোজা রাখাতে কোন অসুবিধা নেই, তবে সেহেরী ও ইফতারের পরে হাইপারগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে গ্লুকোজ অস্বাভাবিক বেড়ে যেতে পারে। তাই, একবারে পেট ভরে না খেয়ে, সমপরিমান খাবারই কয়েকবারে খেলে এই সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। যারা ডায়াবেটিসের মুখে খাওয়ার ঔষধ সেবন করেনঃ ইনসুলিনের কার্যকারিতা বর্ধক (Sensitizer) ঔষধ সাধারণত কোন সমস্যা করে না। ইনসুলিন নিঃসরন বর্ধক (Secretagogues) ঔষধগুলোর কারনে হাইপোগ্লাইসেমিয়া দেখা দিতে পারে। তাই এজাতীয় ঔষধগুলোর ডোজ অথবা ঔষধ পরিবর্তন করা লাগতে পারে। যারা ইনসুলিন নেনঃ দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারে এরূপ ইনসুলিন এর সাথে স্বল্প সময় কাজ করে এরূপ ইনসুলিন এর সমন্বয় করে ইনসুলিন দেওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন ভাবে ইনসুলিন দিয়ে চিকিৎসা করা যেতে পারে, তবে আপনার চিকিৎসক যেটা নির্ধারণ করে দিবেন সেটাই মেনে চলা উচিৎ।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে যাদের ডায়াবেটিস পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে, তাদের রোজা রাখতে কোন বাঁধা নেই। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস রোগীদের সাধারণত খাদ্য গ্রহণের পর রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়। ইনসুলিনের ডোজ সমন্বয় করে এই সমস্যার সমাধান করা যায়। তবে, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস রোগীদের রোজা না রাখার জন্য বিশেষজ্ঞগন পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

রমজানে উচ্চ রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের জন্য উপযুক্ত ঔষধ ব্যবহার করে এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সুপারিশকৃত চিকিৎসা ব্যাবস্থাঃ

(এখানে ঔষধের জেনেরিক নাম ব্যবহার করা হয়েছে, বাজারে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন কোম্পানীর ঔষধ পাওয়া যাবে। প্যাকেটের গায়ে ঔষধের নামের নীচে ছোট করে মূল উপাদানের যে নাম লেখা থাকে সেটাই জেনেরিক নাম)

রমজানের পূর্বে ঔষধ ও ডোজ

রমজানে ঔষধ ও ডোজ

যাদের শুধুমাত্র খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও হাঁটার মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে। কোন পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
যারা ডায়াবেটিসের মুখে খাওয়ার ঔষধ সেবন করেনঃ
মেটফরমিন তিন বেলা মোট ডোজের দুই তৃতীয়াংশ ইফতারের সময়, এক তৃতীয়াংশ সেহেরীর সময়।
মেটফরমিন দুই বেলা সকালের ডোজ ইফতারের সময়, রাতের ডোজের অর্ধেক সেহেরীর সময়।
মেটফরমিন এক বেলা একই ডোজ ইফতারের সময় দিতে হবে।
পায়োগ্লিটাজোন বা রসিগ্লিটাজোন এক বেলা কোন পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।
গ্লিমেপিরাইড বা গ্লিক্লাজাইড এক বেলা একই ডোজ ইফতারের সময় দিতে হবে। প্রয়োজনে ডোজ কিছুটা কমাতে হবে।
গ্লাইবেনক্লামাইড বা গ্লিক্লাজাইড দুই বেলা সকালের ডোজ ইফতারের সময় দিতে হবে। সেহেরীর সময় রাতের ডোজের অর্ধেক দিতে হবে।
রেপাগ্লিনাইড শুধুমাত্র ইফতার ও সেহেরীর সময় দিতে হবে।
ভিলডাগ্লিপটিন, সিটাগ্লিপটিন কোন পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।
যারা ইনসুলিন নেনঃ
এক বেলার ইনসুলিন (লং একটিং এনালগ) কোন পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।
দুই বেলার ইনসুলিন মোট ডোজের অর্ধেক ইফতারের সময় এবং মোট ডোজের এক চতুর্থাংশ সেহেরীর সময় দিতে হবে।
তিন বেলার ইনসুলিন মোট ডোজের অর্ধেক ইফতারের সময় এবং মোট ডোজের এক চতুর্থাংশ সেহেরীর সময় দিতে হবে।
জিএলপি-১ এগোনিস্ট (লিরাগ্লুটাইড) কোন পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।

(সকল ডায়াবেটিস রোগীর জন্য এই ফর্মুলা সমান কার্যকরী নাও হতে পারে। আপনি অবশ্যই রমজানের পূর্বে আপনার ডায়াবেটিস চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ডোজ নির্ধারণ করে নিবেন।)

রমজানের পর পরই ওজন, ব্লাড প্রেশার, লিপিড প্রোফাইল এবং এইচবিএ১সি পরীক্ষা করে পুণরায় সারাবছরের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে কেউ কেউ কিছু অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকেন। আমার অনুরোধ, নিজের স্বার্থেই দয়া করে কোনরূপ অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। এর ফলাফল কোন কোন সময় এতই মারাত্মক হয় যে, সেখান থেকে ফিরে আসা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।

 

ডাঃ এম. মঞ্জুর আহমেদ (সজীব)

এমবিবিএস (সিইউ); পিজিটি (সার্জারী); সিসিডি (বারডেম); ইডিসি (বারডেম)

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি স্বীকৃত ডায়াবেটিস ও ডায়াবেটিক ফুট চিকিৎসক

(ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষন প্রাপ্ত)

 

ডায়াবেটিস রোগ নির্ণয় পদ্ধতি

কোন ব্যক্তির ডায়াবেটিস আছে কি না তা প্রশ্ন হিসেবে খুবই ছোট। কিন্তু এর উত্তর দেওয়া একটি কঠিন ব্যাপার। কেন কঠিন তা বিশদ ভাবে সবার জানা উচিৎ।

ডায়াবেটিস রোগ নির্ণয় করার জন্য সাধারণত ৩ টি পদ্ধতি অনুসরন করা হয়। (১) ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT) (২) ফাস্টিং ব্লাড সুগার (FBS) (৩) রেন্ডম ব্লাড সুগার (RBS)।

আমরা জানি, কারো রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা সকালে খালি পেটে ৭.০ মিলিমোল/লিটার বা তার বেশী হলে অথবা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ শরবত খাওয়ার ২ ঘন্টা পরে ১১.১ মিলিমোল/লিটার বা তার বেশী হলে আমরা তাকে ডায়াবেটিস রোগ বলি।

কিন্তু বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় রোগীর রক্তের রেন্ডম ব্লাড সুগার (RBS) পরীক্ষা করে বলে দেওয়া হয় ঐ ব্যক্তির ডায়াবেটিস আছে অথবা নেই। ডায়াবেটিস রোগ নির্ণয় পদ্ধতি হিসেবে RBS কখনও নিশ্চিত পরীক্ষা নয়। এই পরিক্ষার মাধ্যমে শুধুমাত্র ধারনা পাওয়া যেতে পারে, এর বেশী কিছু না। তবে কারো যদি অজান্তেই উচ্চ মাত্রার ডায়াবেটিস থেকে থাকে, তাহলে RBS পরীক্ষা করে গ্লুকোজের মাত্রা দেখে ডায়াবেটিস সনাক্ত করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে, নিশ্চিত হবার জন্য OGTT পরীক্ষা করতে হবে।

আমাদের দেশে সাধারনত রোগীরা বিকেল বা সন্ধ্যায় চিকিৎসককে দেখিয়ে রক্ত পরীক্ষা করান। দুপুরে খাওয়ার পর বিকেল বা সন্ধ্যায় রক্ত পরীক্ষা করাতে গেলে অনেকটা সময় পেট খালি থাকে। এতে করে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা এমনিতেই কমে যায়, যার ফলে RBS পরীক্ষায় ডায়াবেটিস ধরা পরার সম্ভাবনা কম থাকে। যদি সকালে খালি পেটে অথবা সকালে নাস্তার ২ ঘণ্টা পরে অথবা দুপুরের খাবারের ২ ঘণ্টা পরে পরীক্ষা করেন তাহলে ডায়াবেটিস ধরা পরার সম্ভাবনা কিছুটা বেশী থাকে। মনে রাখবেন, ডায়াবেটিস রোগী না হলে ঐ সময়গুলোতে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অবশ্যই স্বাভাবিক থকবে। আর ডায়াবেটিস হয়ে থাকলে মাত্রা বেশী পাওয়া যাবে।

রেন্ডম ব্লাড সুগার (RBS) পরীক্ষা করে গ্লুকোজের মাত্রা ১১.১ মিলিমোল/লিটার বা তার বেশী পেলে সম্ভবত তার ডায়াবেটিস আছে, ৫.৫ মিলিমোল/লিটার – ১১.১ মিলিমোল/লিটার এর ভিতরে থাকলে ডায়াবেটিস অনিশ্চিত, ৫.৫ মিলিমোল/লিটার এর নীচে থাকলে ডায়াবেটিস নেই বলে ধরে নিতে হবে। প্রথম দুই ক্ষেত্রে নিশ্চিত হবার জন্য OGTT পরীক্ষা করতে হবে।

এক্ষেত্রে, ফাস্টিং ব্লাড সুগার (FBS) পরীক্ষা RBS এর চেয়ে অনেক বেশী ইঙ্গিতবহ। কারো রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা সকালে খালি পেটে ৭.০ মিলিমোল/লিটার বা তার বেশী হলে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় ডায়াবেটিস হয়েছে। যদি, FBS ৬.১-৬.৯ মিলিমোল/লিটার ভিতরে থাকে তাহলে ইম্পায়ার্ড ফাস্টিং গ্লুকোজ (IFG) হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। অর্থাৎ, ঐ ব্যাক্তির ডায়াবেটিস হয়নি কিন্তু হওয়ার পথে।

ডায়াবেটিস নির্ণয় করার জন্য বিশ্ব স্বীকৃত পদ্ধতি হল OGTT (Oral Glucose Tolerance Test)।  এক্ষেত্রে সকালে খালি পেটে একবার রক্ত দিতে হয় এবং ২৫০-৩০০ মিলিলিটার পানিতে ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ মিশিয়ে শরবত বানিয়ে খাওয়ার ২ ঘন্টা পরে আবার রক্ত দিতে হয়। এভাবে, খালি পেটে অথবা গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘণ্টা পরে – যে কোনটার রিপোর্টে গ্লুকোজের মাত্রা বেশী পাওয়া গেলে তাকে ডায়াবেটিস হিসেবে গন্য করতে হবে।

সকালে খালি পেটে

(মিলিমোল/লিটার)

গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘন্টা পর

(মিলিমোল/লিটার)

সিদ্ধান্ত

৭.০ বা তার বেশী ১১.১ বা তার বেশী ডায়াবেটিস আছে
৭.০ এর নীচে ৭.৮ থেকে ১১.১ এর নীচে ইম্পায়ার্ড গ্লুকোজ টলারেন্স (IGT)
৬.১ থেকে ৭.০ এর নীচে ৭.৮ এর নীচে ইম্পায়ার্ড ফাস্টিং গ্লুকোজ (IFG)
৬.১ এর নীচে ৭.৮ এর নীচে স্বাভাবিক (ডায়াবেটিস নেই)

 

এখানে, IGT এবং IFG কে প্রি-ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিসের পূর্বাবস্থা বলা হয়। অর্থাৎ, রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা IGT এবং IFG পর্যায়ে থাকলে ঐ ব্যক্তির সহসাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা আছে। এক্ষেত্রে কতগুলো নিয়ম মানলে ডায়াবেটিস সহজে হবে না। যেমনঃ (১) ফাস্ট ফুড জাতীয় খাদ্য বর্জন করুন। যথাসম্ভব ঘরে তৈরী খাদ্য গ্রহণের চেষ্টা করুন। ঘরে তৈরী খাদ্যে অতিরিক্ত তেল-চর্বি বাদ দিতে হবে। যেমনঃ তেলের/ঘিয়ের পরোটার পরিবর্তে শুকনা আটার রুটি খেতে হবে, গরু-খাসীর মাংশ রান্নার আগে সব চর্বি ফেলে দিতে হবে, মুরগীর চামড়া খাওয়া যাবেনা, তৈলাক্ত ও চর্বিযুক্ত মাছ বর্জন করতে হবে। কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক এগুলো যথা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। তিন বেলার খাবারকে ভাগ করে যদি ৫ বারে খাই তাহলে উপকার পাওয়া যাবে অর্থাৎ (ক) সকালের নাস্তা (খ) সকাল ও দুপুরের খাবারের মাঝামাঝি সময়ে হালকা নাস্তা (গ) দুপুরের খাবার (ঘ) বিকালে নাস্তা এবং (ঙ) রাতের খাবার (২) দৈনিক দুই বেলা আধা ঘন্টা করে দ্রুত হাঁটার অভ্যাস করতে হবে। খালি পেটে এবং খালি পায়ে হাঁটবেন না।  (৩) অতিরিক্ত ও অসময়ের ঘুম ত্যাগ করতে হবে। (৪) উচ্চতা অনুযায়ী আপনার ওজন যতটুকু হওয়া উচিৎ তার থেকে বেশী মেদ-ভুঁড়ি বা ওজন থাকলে তা কমিয়ে সমান করতে হবে। (৫) ধূমপান, মদ্যপান বা সাদাপাতা-জর্দা দিয়ে পান খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা ত্যাগ করতে হবে।

এগুলো কড়াকড়ি ভাবে মানতে পারলে ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা কমে যায়।

অনেকে OGTT পরীক্ষায় ৩ বার রক্ত পরীক্ষা করেন – (১) সকালে খালি পেটে (২) গ্লুকোজ শরবত খাওয়ার ১ ঘণ্টা পরে (৩) গ্লুকোজ শরবত খাওয়ার ২ ঘণ্টা পরে। এক্ষেত্রে ২ বার রক্ত পরীক্ষা করালেই যথেষ্ট – (১) সকালে খালি পেটে এবং (২) গ্লুকোজ শরবত খাওয়ার ২ ঘণ্টা পরে।

 প্রশ্রাবে গ্লুকোজ (গ্লাইকোসুরিয়া) থাকলে অনেকে মনে করতে পারেন তার ডায়াবেটিস হয়েছে। আসলে তা না। ডায়াবেটিস ছাড়াও আরও বিভিন্ন কারণে প্রশ্রাবের সাথে গ্লুকোজ যেতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই OGTT পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে নিবেন।

অনেকে নিজের বাসায় বা কোন ফার্মেসী থেকে গ্লুকোমিটার দিয়ে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করান। যাদের এখনো ডায়াবেটিস হয়নি অথবা ডায়াবেটিস আছে কিনা জানা নেই, তাদের জন্য গ্লুকোমিটার দিয়ে পরীক্ষা করে ডায়াবেটিস আছে কি নেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ না। যাদের ডায়াবেটিস আছে তাঁরা গ্লুকোমিটার দিয়ে সবসময় বাসায় পরীক্ষা করে দেখবেন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা। মনে রাখবেন, গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্ত পরীক্ষা করলে তা ১৫% কম বা বেশী দেখাতে পারে। গ্লুকোমিটার দিয়ে আমরা সরাসরি লাল রক্ত থেকে গ্লুকোজ মাপি, কিন্তু প্যাথলজী সেন্টার গুলোতে রোগীর কাছ থেকে রক্ত নিয়ে রক্তের রস (প্লাজমা) আলাদা করে সেখান থেকে গ্লুকোজ পরীক্ষা করে। তাই এটি অনেক বেশী নির্ভুল হয়।

 কারো ডায়াবেটিস ধরা পড়লে গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন  (HbA1c) পরীক্ষা করাতে হবে।

 

গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন  (HbA1c)

গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন  (HbA1c) হিমোগ্লোবিনের একটি রূপ, যা প্রাথমিকভাবে রক্তে দীর্ঘ সময়ের গড় গ্লুকোজ ঘনত্বকে বোঝায়। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দীর্ঘদিন স্বাভাবিক থাকলে HbA1c এর পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অনেকদিন ধরে বেশী থাকলে HbA1c এর পরিমাণ বেড়ে যায়। সাধারনত বিগত ৩ মাস রক্তের গড় গ্লুকোজের মাত্রা কম না বেশী ছিল তা HbA1c এর পরিমাণ থেকেই বোঝা যায়। কোনও ডায়াবেটিস রোগীর উচ্চ মাত্রার HbA1c থাকা প্রমান করে যে, বিগত মাসগুলোতে সঠিকভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। ডায়াবেটিস রোগীর উচ্চ মাত্রার HbA1c বিভিন্ন ডায়াবেটিক জটিলতার সাথে সম্পর্ক যুক্ত যেমনঃ হৃদরোগ (Cardiovascular Disease), কিডনীর রোগ (Nephropathy), চোখের রোগ (Retinopathy) ইত্যাদি।

রক্তে উচ্চ মাত্রায় গ্লুকোজ থাকলে তা লোহিত কনিকার হিমোগ্লোবিনের সাথে সংযুক্ত হয়ে গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিনে রূপান্তরিত হয় এবং ঐ লোহিত কনিকা যতদিন বেঁচে থাকে, গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন নিয়েই বেঁচে থাকে।

প্রতি ৩ মাস পর পর HbA1c পরীক্ষা করা উচিৎ। বর্তমানে HbA1c কে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ডায়াবেটিস চিকিৎসার একটি মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। এর মাত্রার তারতম্য অনুসারে চিকিৎসায় পরিবর্তন আনতে হয়।

ডায়াবেটিস রোগীর গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন  (HbA1c) এর স্বাভাবিক মাত্রা ৭% এর নীচে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ৬.৫% এর নীচে এবং ডায়াবেটিক শিশুদের জন্য ৮.৫% এর নীচে (০-৬ বৎসর), ৮% এর নীচে (৬-১২ বৎসর) এবং ৭.৫% এর নীচে (১২-১৮ বৎসর)।

সাধারনত মুখে খাওয়ার ঔষধের চেয়ে ইনসুলিন ব্যবহারকারী ডায়াবেটিক রোগীদের HbA1c এর মাত্রা তুলনামূলক ভাল থাকে। বর্তমানে বাজারে পাওয়া যায়, নতুন ধরনের এমন কিছু মুখে খাওয়ার ঔষধ আছে যা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি HbA1c কমাতে বেশ কার্যকর।

 কোন কোন গবেষক বলেন, ৩ মাস পর পর যদি অন্তত ২ বার HbA1c এর মাত্রা ৬.৫% এর উপর থাকে তাহলে তার ডায়াবেটিস থাকতে পারে বলে ধরে নিতে হবে। সেক্ষেত্রে OGTT পরীক্ষা করিয়ে ডায়াবেটিস আছে কি না, নিশ্চিত হওয়া উচিৎ।

GCT জিসিটিঃ গর্ভকালীন মায়েদের ডায়াবেটিস আছে কিনা তা জানার জন্য GCT নামে একটি পরীক্ষা পদ্ধতি আছে। দিনের যে কোন সময়ে (খালি বা ভরা পেট যে কোন ভাবে) মা’কে ৫০ গ্রাম গ্লুকোজের শরবত খাওয়ানোর ১ ঘণ্টা পরে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ৭.৮ মিলিমোল/লিটার বা তার চেয়ে বেশী হলে তাকে GCT পজিটিভ হিসেবে ধরে নিতে হবে। GCT পজিটিভ হলে অবশ্যই OGTT পরীক্ষা করতে হবে।

হাইপারগ্লাইসেমিয়া

ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অস্বাভাবিকরকম বেড়ে যাওয়াকে হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলা হয়। সাধারনত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ১১.১ মিলিমোল/লিটার বা তার বেশী হলে তাকে হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বেশী (১৫-২০ মিলিমোল/লিটার) না হলে সাধারনত উপসর্গ দেখা দেয় না। ডায়াবেটিক রোগীর দীর্ঘকালীন জটিলতা দেখা দেয় মূলত হাইপারগ্লাইসেমিয়ার জন্য।

কারও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ করে ৮-১৫ মিলিমোল/লিটার বা তার উপর উঠে গেলে তাকে তীব্র হাইপারগ্লাইসেমিয়া (একিউট হাইপারগ্লাইসেমিয়া) বলে। গ্লুকোমিটার দিয়ে ঘরে বসেই তা পরীক্ষা করা যায়।

রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে বা হাইপারগ্লাইসেমিয়া হলে হাঁটা বা ব্যায়ামের পরিমান বাড়িয়ে, খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে, ঔষধ খেয়ে বা ইনসুলিন নিয়ে যে কোন ভাবেই হোক রক্তের গ্লুকোজ কমাতে হবে তা না হলে রক্তে কিটোন বডি (কিটো এসিড) বেড়ে গিয়ে প্রশ্রাবে কিটো এসিড চলে আসবে। প্রশ্রাবে কিটো এসিড আসা মানে রোগী তীব্র হাইপারগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। এতে রোগীর জীবন বিপন্ন হবার সম্ভাবনা থাকে।

কারও রক্তে সবসময় গ্লুকোজের মাত্রা ৮ মিলিমোলের উপর থাকাকে দীর্ঘস্থায়ী হাইপারগ্লাইসেমিয়া (ক্রনিক হাইপারগ্লাইসেমিয়া) বলে। দীর্ঘস্থায়ী হাইপারগ্লাইসেমিয়া রক্তনালী এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি সাধন করে এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি করে। দীর্ঘস্থায়ী হাইপারগ্লাইসেমিয়া গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (এইচবিএ১সি) পরীক্ষার মাধ্যমে পরিমাপ করা যায়।

হাইপারগ্লাইসেমিয়া শুধুমাত্র ডায়াবেটিস রোগীর বেলায় ঘটবে তা নয়, ডায়াবেটিস ছাড়াও হাইপারগ্লাইসেমিয়া হতে পারে যেমন- কিছু কিছু ঔষধ এর কারনে (স্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ, বিটা ব্লকার, এপিনেফ্রিন, থায়াজাইড ডাই-ইউরেটিকস, নিয়াসিন, পেন্টামিডিন, কোন কোন এন্টি-সাইকোটিক ড্রাগ ইত্যাদি), কোন কোন রোগের কারনে (যেমন-ব্রেইনের স্ট্রোক, হার্টের মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন, থাইরয়েড এর রোগ, পিটুইটারীর রোগ, প্যানক্রিয়াসের রোগ ইত্যাদি), মেজর সার্জারীর ফলে অস্থায়ীভাবে গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধি হতে পারে।

খাওয়ার আগে ও পড়ে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরিবর্তিত হয়। ডায়াবেটিস রোগীর সাধারনত দুই সময়ে হাইপারগ্লাইসেমিয়া হয়- ফাষ্টিং হাইপারগ্লাইসেমিয়া এবং পোষ্ট প্র্যানডিয়াল হাইপারগ্লাইসেমিয়া।

ফাষ্টিং হাইপারগ্লাইসেমিয়াঃ
সকালে নাস্তার আগে (খালি পেটে) রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা সবসময় ৭ মিলিমোল/লিটার এর উপরে থাকাকে ফাষ্টিং হাইপারগ্লাইসেমিয়া বা অভুক্ত হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলে।

পোষ্ট প্র্যানডিয়াল হাইপারগ্লাইসেমিয়াঃ
খাদ্য গ্রহণের পর রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা সবসময় ১০ মিলিমোল/লিটার এর উপরে থাকাকে পোষ্ট প্র্যানডিয়াল হাইপারগ্লাইসেমিয়া বা খাদ্য গ্রহণ পরবর্তী হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলে। নন-ডায়াবেটিক ব্যক্তিরও খাদ্য গ্রহণের পর রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ১০ মিলিমোল/লিটার এর উপরে উঠে যেতে পারে, তবে দুয়েক ঘন্টার মধ্যে তা আবার ৮ মিলিমোল/লিটার এর নীচে নেমে আসে। কিন্তু ডায়াবেটিক রোগীর বেলায় এটা না নামলে তাকে পোষ্ট প্র্যানডিয়াল হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলা হবে।

কোন কোন রোগীর সারাদিন ডায়াবেটিস বেশ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় কিন্তু ফাষ্টিং হাইপারগ্লাইসেমিয়া থাকে। তাদের ক্ষেত্রে গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (এইচবিএ১সি) খুব বেশী বেড়ে যায়। এই ধরণের রোগীদের পরবর্তীতে ডায়াবেটিক জটিলতা বেশী হয়।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনের লক্ষ্যমাত্রাঃ
সকালের নাস্তার আগে (খালি পেটে) রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ৬.১ মিলিমোল/লিটার (১১০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার) এর নীচে, খাওয়ার পরে ৮ মিলিমোল/লিটার (১৪৫ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার) এর নীচে রাখতে হবে। গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (এইচবিএ১সি) ৭% এর নীচে রাখতে হবে। লো ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (এলডিএল কোলেস্টেরল) ১০০ এর নীচে, হাই ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (এইচডিএল) কোলেস্টেরল ৪০ এর উপরে, ট্রাইগ্লিসারাইড (টিজি) ১৫০ এর নীচে, রক্তচাপ (বিপি) ১৩০/৮০ এর নীচে রাখতে হবে। বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ২৫ কেজি/বর্গমিটার এর নীচে রাখতে হবে।

ডায়াবেটিস রোগীর হাইপারগ্লাইসেমিয়ার কারনঃ
 ডায়াবেটিসের মুখে খাওয়ার ঔষধ বা ইনসুলিনের ডোজ বাদ পড়লে বা ডোজ কম হলে
 শর্করা/কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য অতিরিক্ত গ্রহণের ফলে
 শরীরে বিভিন্ন ধরণের ইনফেকশনের ফলে
 শারীরিক অসুস্থ্যতার কারণে
 বর্ধিত শারীরিক বা মানসিক চাপের ফলে
 স্বাভাবিক কাজকর্ম এবং ব্যায়াম না করার ফলে

হাইপারগ্লাইসেমিয়ার প্রাথমিক লক্ষণঃ
 অতিরিক্ত তৃষ্ণা লাগা বা গলা শুকানো
 মাথাব্যাথা করা
 কোন কিছুতে মনোযোগহীনতা
 ঝাপসা দৃষ্টি
 ঘন ঘন মূত্রত্যাগ
 ক্লান্তি (দুর্বল, ক্লান্ত অনুভূতি)
 ওজন কমে যাওয়া
 সবসময় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ১০ মিলিমোল/লিটার এর উপরে থাকা

দীর্ঘস্থায়ী হাইপারগ্লাইসেমিয়ার ক্ষতিঃ

 যোনিপথে (মহিলাদের) এবং ত্বকে (সবার) সংক্রমণ
 ক্ষতস্থান ধীরগতিতে শুকানো
 দৃষ্টি শক্তি কমে যাওয়া
 নার্ভসমূহ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কারণে- অসংবেদী পা, পায়ের লোম পড়ে যাওয়া, কোন কোন পুরুষের পৌরুষত্ব কমে যাওয়া ইত্যাদি
 কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া থাকা
 চোখ, রক্তনালী বা কিডনির ক্ষতি
 হৃদরোগ ও স্ট্রোক এর ঝুঁকি বৃদ্ধি

চিকিৎসাঃ
১। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট খাদ্য তালিকা মেনে চলুন
২। নিয়মিত স্বাভাবিক কাজকর্ম, হাঁটা ও ব্যায়াম চালিয়ে যান
৩। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ডোজ মতো ডায়াবেটিসের ঔষধ খেতে হবে বা ইনসুলিন নিতে হবে। কোন ভাবেই চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া নিজে নিজে ঔষধ বা ইনসুলিন বাদ দেওয়া বা ডোজ কমানো যাবে না
৪। শর্করা/কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার পরিমানের বেশী খাবেন না
৫। অপ্রয়োজনীয় ও অবেলার খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন (যেমন- যখন তখন চা-বিস্কুট, সিঙ্গারা-সমুচা-ডালপুরী-মিষ্টি ইত্যাদি)
৬। প্রতিমাসে কমপক্ষে একবার আপনার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন
৭। বাসায় গ্লুকোমিটার রাখুন ও ব্যবহার করতে শিখুন


তীব্র হাইপারগ্লাইসেমিয়ার বিপদঃ

সাধারনত দুই ভাবে তীব্র হাইপারগ্লাইসেমিয়া প্রকাশ পায়ঃ
১। ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ)
২। হাইপার অসমোলার নন কিটোটিক কোমা (এইচওএনকে) / হাইপার অসমোলার হাইপার গ্লাইসেমিক স্টেট (এইচএইচএস)

ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ)
ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ) হলো ডায়াবেটিস রোগীর সম্ভাব্য জীবনের হুমকি স্বরূপ একটি জটিলতা। এটি প্রধানত টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে ঘটে থাকে, তবে কোন কোন ক্ষেত্রে টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীর বেলায়ও হতে পারে। শরীরে যখন ইনসুলিনের ঘাটতি দেখা দেয় তখন গ্লুকোজ থেকে শক্তি উৎপাদন না হয়ে ফ্যাটি এসিড ভেঙ্গে শক্তি উৎপাদন হয়। এই চক্রে ফ্যাটি এসিড ভেঙ্গে কিটো এসিড সৃষ্টি হয়। রক্তের কিটো এসিড প্রশ্রাবের সাথে বের হতে থাকে। কিটো এসিডের জন্যই বিভিন্ন মারাত্মক উপসর্গ দেখা দেয়।

ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ) এর ক্ষেত্রে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা সাধারনত ১৬ মিলিমোল/লিটার এর বেশী থাকে। গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্ত পরীক্ষা করে সাথে সাথেই এটা জেনে নেওয়া সম্ভব।

লক্ষনঃ বমি ভাব, কফি রঙ্গের বমি, তীব্র পানি পিপাসা, প্রচুর প্রশ্রাব হওয়া, পেটের ব্যাথা, ঘন ঘন গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস, বিভ্রান্তি ভাব, তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব, অসাড়তা, অচেতনাবস্থা, পানি শুন্যতা, দ্রুত গতির পালস্, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং প্রশ্রাবে বিশেষ গন্ধ পাওয়া এই রোগের লক্ষণ। তবে সবার ক্ষেত্রে একই লক্ষণ প্রকাশ নাও পেতে পারে।

চিকিৎসাঃ
ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ) একটি মেডিকেল ইমারজেন্সি। ডায়াবেটিস রোগীর এই ধরণের লক্ষণ দেখা দিলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে দ্রুত কার্যকরী ইনসুলিন, সোডিয়াম যুক্ত স্যালাইন, পটাসিয়াম ও বাইকার্বনেট দিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। কোন অবস্থায়ই বাসায় বা চেম্বারে চিকিৎসা দেওয়া যাবে না। দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা দিতে না পারলে রোগীর ব্রেইনে পানি জমে যেতে পারে। এই অবস্থা থেকে রোগীকে ফিরিয়ে আনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।

হাইপার অসমোলার নন-কিটোটিক কোমা (এইচওএনকে) / হাইপারঅসমোলার হাইপারগ্লাইসেমিক স্টেট (এইচএইচএস)
এটি হলো ডায়াবেটিস রোগীর তীব্র হাইপারগ্লাইসেমিয়া জনিত একটি জটিলতা। এটি মূলত টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। উচ্চ মাত্রার গ্লুকোজের কারণে তীব্র পানি শুন্যতা দেখা দেয়। রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যায়, রোগী অচেতন হয়ে যায় এবং দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা শুরু করতে না পারলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই ক্ষেত্রে রক্ত ও প্রশ্রাবে কিটো এসিডের মাত্রা ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ) এর মতো তেমন বেশী বৃদ্ধি পায় না।

হাইপার অসমোলার নন-কিটোটিক কোমা (এইচওএনকে) / হাইপারঅসমোলার হাইপারগ্লাইসেমিক স্টেট (এইচএইচএস) এর ক্ষেত্রে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা সাধারনত ৩৩ মিলিমোল/লিটার এর বেশী থাকে। গ্লুকোমিটার দিয়ে তাৎক্ষনিক ভাবেই তা জেনে নেওয়া যায়।

লক্ষনঃ মানসিক ভারসাম্য হারানো, নড়বড়ে অবস্থা, বিষণ্ণতা, কম্পন, পেশীতে টান পড়া, রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি।

চিকিৎসাঃ
হাইপার অসমোলার নন-কিটোটিক কোমা (এইচওএনকে) / হাইপারঅসমোলার হাইপারগ্লাইসেমিক স্টেট (এইচএইচএস) অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস রোগীর জন্য আরও একটি মেডিকেল ইমারজেন্সি। ডায়াবেটিস রোগীর এই ধরণের লক্ষণ দেখা দিলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে দ্রুত কার্যকরী ইনসুলিন, সোডিয়াম যুক্ত স্যালাইন ও রক্তের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ইলেক্ট্রোলাইট দিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। কোন অবস্থায়ই বাসায় বা চেম্বারে চিকিৎসা দেওয়া যাবে না। দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা দিতে না পারলে রোগীকে বাঁচানোর সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

 

ডাঃ এম. মঞ্জুর আহমেদ (সজীব)

এমবিবিএস (সিইউ); পিজিটি (সার্জারী); সিসিডি (বারডেম); ইডিসি (বারডেম)

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি স্বীকৃত ডায়াবেটিস ও ডায়াবেটিক ফুট চিকিৎসক

(ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষন প্রাপ্ত)

গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (HbA1c)

গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (HbA1c) হিমোগ্লোবিনের একটি রূপ, যা প্রাথমিকভাবে রক্তে দীর্ঘ সময়ের গড় গ্লুকোজ ঘনত্বকে বোঝায়। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দীর্ঘদিন স্বাভাবিক থাকলে HbA1c এর পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অনেকদিন ধরে বেশী থাকলে HbA1c এর পরিমাণ বেড়ে যায়। সাধারনত বিগত ৩ মাস রক্তের গড় গ্লুকোজের মাত্রা কম না বেশী ছিল তা HbA1c এর পরিমাণ থেকেই বোঝা যায়। ডায়াবেটিস রোগীদের উচ্চ মাত্রার HbA1c প্রমান করে যে, বিগত মাসগুলোতে সঠিকভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। ডায়াবেটিস রোগীর উচ্চ মাত্রার HbA1c বিভিন্ন ডায়াবেটিক জটিলতার সাথে সম্পর্ক যুক্ত যেমনঃ হৃদরোগ (Cardiovascular Disease), কিডনীর রোগ (Nephropathy), চোখের রোগ (Retinopathy) ইত্যাদি।

রক্তে উচ্চ মাত্রায় গ্লুকোজ থাকলে তা লোহিত কনিকার হিমোগ্লোবিনের সাথে সংযুক্ত হয়ে গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিনে রূপান্তরিত হয় এবং ঐ লোহিত কনিকা যতদিন বেঁচে থাকে, গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন নিয়েই বেঁচে থাকে।

প্রতি ৩ মাস পর পর HbA1c পরীক্ষা করা উচিৎ। বর্তমানে HbA1c কে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনের একটি মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। এর মাত্রার তারতম্য অনুসারে চিকিৎসায় পরিবর্তন আনতে হয়।
ডায়াবেটিস রোগীর গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (HbA1c) এর স্বাভাবিক মাত্রা ৭% এর নীচে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিক রোগীর জন্য ৬.৫% এর নীচে এবং ডায়াবেটিক শিশুদের জন্য ৮.৫% এর নীচে (০-৬ বৎসর), ৮% এর নীচে (৬-১২ বৎসর) এবং ৭.৫% এর নীচে (১২-১৮ বৎসর)।

সাধারন মুখে খাওয়ার ঔষধের চেয়ে ইনসুলিন ব্যবহারকারী ডায়াবেটিক রোগীদের HbA1c এর মাত্রা তুলনামূলক ভাল থাকে। বর্তমানে বাজারে পাওয়া যায় নতুন ধরনের এমন কিছু মুখে খাওয়ার ঔষধ আছে যা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি HbA1c কমাতে বেশ কার্যকর।

হাইপোগ্লাইসেমিয়া

ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অস্বাভাবিকরকম কমে যাওয়াকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা গ্লুকোজ নিল হয়ে যাওয়া। এটি বিভিন্ন উপসর্গ উত্পাদন করতে পারে তবে প্রধান সমস্যা হল মস্তিষ্কে গ্লুকোজ এর অপর্যাপ্ত সরবরাহ। ফলে শরীরের স্বাভাবিক ক্রিয়াগুলো সম্পাদনে বৈকল্য দেখা দেয়।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার প্রভাব হালকা অসুস্থ বোধ করা থেকে আরো গুরুতর বিষয় বিস্তৃত হতে পারে যেমন অধিগ্রহণ, অসাড়তা, এবং (কদাচিৎ) স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি বা মৃত্যু।

হাইপোগ্লাইসিমিয়া সাধারণত ডায়াবেটিস চিকিত্সায় ইনসুলিন বা মুখে খাবার কোন কোন ঔষধের কারনে ঘটে।

রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ৪৫ মিলিগ্রাম (২.৫ মিলিমোল) এর নীচে নেমে গেলে এবং নিউরোগ্লাইকোপেনিক ও এড্রেনার্জিক চিহ্ন প্রকাশ পেলে তাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলা হয়।

নিউরোগ্লাইকোপেনিক চিহ্ন

  • মাথাব্যাথা
  • বিহ্বলতা ভাব
  • চোখের দৃষ্টির গোলমাল
  • আচরণগত অস্বাভাবিকতা
  • তন্দ্রাচ্ছন্নভাব
  • খিঁচুনি
  • অচেতনাবস্থা

এড্রেনার্জিক চিহ্ন

  • ঘামতে থাকা
  • বুক ধড়ফড়ানি
  • কাঁপতে থাকা
  • খেপে যাওয়া
  • ক্ষুধা লাগা
চিহ্ন সমূহ

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার মাত্রানুযায়ী লক্ষণ

কম হাইপোগ্লাইসেমিয়া

মাঝারী হাইপোগ্লাইসেমিয়া

তীব্র হাইপোগ্লাইসেমিয়া

এড্রেনার্জিক চিহ্ন
  • ঘামতে থাকা
  • বুক ধড়ফড়ানি
  • কাঁপতে থাকা
  • খেপে যাওয়া
  • ক্ষুধা লাগা

 

  • ঘামতে থাকা
  • বুক ধড়ফড়ানি
  • কাঁপতে থাকা
  • খেপে যাওয়া
  • ক্ষুধা লাগা

 

  • অনুপস্থিত
নিউরোগ্লাইকোপেনিক চিহ্ন
  • অনুপস্থিত
  • মাথাব্যাথা
  • বিহ্বলতা ভাব
  • চোখের দৃষ্টির গোলমাল
  • আচরণগত অস্বাভাবিকতা
  • তন্দ্রাচ্ছন্নভাব
  • খিঁচুনি
  • অচেতনাবস্থা

 

 

 

অনবগত (Unaware) হাইপোগ্লাইসেমিয়াঃ অনেকদিন যাবত ডায়াবেটিস থাকলে, অটোনোমিক নার্ভের দুর্বলতা থাকলে, নন-সিলেক্টিভ বিটা-ব্লকার জাতীয় ঔষধ খেলে বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অতিমাত্রায় কড়াকড়ি করলে অনেকের এড্রেনার্জিক চিহ্নগুলো প্রকাশ পায় না। একে অনবগত (Unaware) হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলে। অর্থাৎ, হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলেও বুঝতে পারেন না।

নৈশকালীন (Nocturnal) হাইপোগ্লাইসেমিয়াঃ কোন কোন ডায়াবেটিস রোগীর রাতে ঘুমের মধ্যে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়। সাধারনতঃ রাত ২টা – ৪টার মধ্যে ঘটে। রোগীর পাশে কেউ থাকলে সে রোগীর কাঁপুনি বা ঘেমে যাওয়া টের পায়। কখনও কখনও সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর রোগীর মাথাব্যাথা, মাথা ঘোরা, রাতের কথা ভুলে যাওয়া বা বিহ্বলতা ভাব দেখা দেয়।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার কারনঃ

ডায়াবেটিস রোগীর সাধারনতঃ নিম্নলিখিত কারনে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ঃ

  • খুব বেশী মাত্রায় ইনসুলিন নিলে
  • বেশী মাত্রায় ইনসুলিন নিঃসরন বর্ধক (Secretagogues) ট্যাবলেট খেলে
  • সময়মত খাবার না খেলে বা কোন বেলার খাবার না খেলে
  • স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত সময় ব্যায়াম করলে
  • এলকোহলের আসক্তি থাকলে
  • কিডনী বা লিভারের তীব্র অস্বাভাবিকতা থাকলে

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার চিকিৎসাঃ

কম ও মাঝারী হাইপোগ্লাইসেমিয়াঃ

এক্ষেত্রে রোগী নিজেই বা পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসা করতে পারেন। সাধারনতঃ ১৫ গ্রাম গ্লুকোজ বা ১ গ্লাস ফলের জুস বা কয়েক চামচ চিনির পানি পান করলে সেরে যায়। যদি কোন বেলার নাস্তা বা খাবার বাদ পড়ে থাকে তাহলে তা খেয়ে নিতে হবে। রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ৫.৫ মিলিমোল/লিটার হলে রোগী বিপদমুক্ত হবে। না হলে ১৫ মিনিট পর পর উপরোক্ত চিকিৎসা দিতে হবে। যারা ইনসুলিন নেন তারা এই চিকিৎসায় দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যান, যারা ইনসুলিন নিঃসরন বর্ধক ট্যাবলেট খান তাদের তুলনায়। বার বার হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করা উচিৎ। হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ঔষধ বা ইনসুলিনের ডোজ পুনঃনির্ধারণ করতে হবে।

তীব্র হাইপোগ্লাইসেমিয়াঃ

তীব্র হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় রোগী সাধারনতঃ স্বল্প জ্ঞান বা অজ্ঞান হয়ে যান। গ্লুকমিটার দিয়ে আঙ্গুল থেকে রক্ত পরীক্ষা করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে বাসায় কোন চিকিৎসা করার সুযোগ থাকে না।

অনবগত (Unaware) হাইপোগ্লাইসেমিয়াঃ

নিয়মিত ও ঘন ঘন রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করে এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা ও ঔষধের ডোজ পরিবর্তন করে তীব্র হাইপোগ্লাইসেমিয়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

নৈশকালীন (Nocturnal) হাইপোগ্লাইসেমিয়াঃ

রাতের ইনসুলিনের ডোজ কমাতে হবে। সম্ভব হলে রাতের খাবারের আগে গ্লুকোজ পরীক্ষা করে ইনসুলিন নিতে হবে।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার রোগীদের হাইপোগ্লাইসেমিয়া সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে হাইপোগ্লাইসেমিয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

 

ডাঃ এম. মঞ্জুর আহমেদ (সজীব)

এমবিবিএস (সিইউ); পিজিটি (সার্জারী); সিসিডি (বারডেম); ইডিসি (বারডেম)

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি স্বীকৃত ডায়াবেটিস ও ডায়াবেটিক ফুট চিকিৎসক

(ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষন প্রাপ্ত)