গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (HbA1c)

গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (HbA1c) হিমোগ্লোবিনের একটি রূপ, যা প্রাথমিকভাবে রক্তে দীর্ঘ সময়ের গড় গ্লুকোজ ঘনত্বকে বোঝায়। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দীর্ঘদিন স্বাভাবিক থাকলে HbA1c এর পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অনেকদিন ধরে বেশী থাকলে HbA1c এর পরিমাণ বেড়ে যায়। সাধারনত বিগত ৩ মাস রক্তের গড় গ্লুকোজের মাত্রা কম না বেশী ছিল তা HbA1c এর পরিমাণ থেকেই বোঝা যায়। ডায়াবেটিস রোগীদের উচ্চ মাত্রার HbA1c প্রমান করে যে, বিগত মাসগুলোতে সঠিকভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। ডায়াবেটিস রোগীর উচ্চ মাত্রার HbA1c বিভিন্ন ডায়াবেটিক জটিলতার সাথে সম্পর্ক যুক্ত যেমনঃ হৃদরোগ (Cardiovascular Disease), কিডনীর রোগ (Nephropathy), চোখের রোগ (Retinopathy) ইত্যাদি।

রক্তে উচ্চ মাত্রায় গ্লুকোজ থাকলে তা লোহিত কনিকার হিমোগ্লোবিনের সাথে সংযুক্ত হয়ে গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিনে রূপান্তরিত হয় এবং ঐ লোহিত কনিকা যতদিন বেঁচে থাকে, গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন নিয়েই বেঁচে থাকে।

প্রতি ৩ মাস পর পর HbA1c পরীক্ষা করা উচিৎ। বর্তমানে HbA1c কে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনের একটি মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। এর মাত্রার তারতম্য অনুসারে চিকিৎসায় পরিবর্তন আনতে হয়।
ডায়াবেটিস রোগীর গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (HbA1c) এর স্বাভাবিক মাত্রা ৭% এর নীচে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিক রোগীর জন্য ৬.৫% এর নীচে এবং ডায়াবেটিক শিশুদের জন্য ৮.৫% এর নীচে (০-৬ বৎসর), ৮% এর নীচে (৬-১২ বৎসর) এবং ৭.৫% এর নীচে (১২-১৮ বৎসর)।

সাধারন মুখে খাওয়ার ঔষধের চেয়ে ইনসুলিন ব্যবহারকারী ডায়াবেটিক রোগীদের HbA1c এর মাত্রা তুলনামূলক ভাল থাকে। বর্তমানে বাজারে পাওয়া যায় নতুন ধরনের এমন কিছু মুখে খাওয়ার ঔষধ আছে যা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি HbA1c কমাতে বেশ কার্যকর।

হাইপোগ্লাইসেমিয়া

ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অস্বাভাবিকরকম কমে যাওয়াকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা গ্লুকোজ নিল হয়ে যাওয়া। এটি বিভিন্ন উপসর্গ উত্পাদন করতে পারে তবে প্রধান সমস্যা হল মস্তিষ্কে গ্লুকোজ এর অপর্যাপ্ত সরবরাহ। ফলে শরীরের স্বাভাবিক ক্রিয়াগুলো সম্পাদনে বৈকল্য দেখা দেয়।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার প্রভাব হালকা অসুস্থ বোধ করা থেকে আরো গুরুতর বিষয় বিস্তৃত হতে পারে যেমন অধিগ্রহণ, অসাড়তা, এবং (কদাচিৎ) স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি বা মৃত্যু।

হাইপোগ্লাইসিমিয়া সাধারণত ডায়াবেটিস চিকিত্সায় ইনসুলিন বা মুখে খাবার কোন কোন ঔষধের কারনে ঘটে।

রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ৪৫ মিলিগ্রাম (২.৫ মিলিমোল) এর নীচে নেমে গেলে এবং নিউরোগ্লাইকোপেনিক ও এড্রেনার্জিক চিহ্ন প্রকাশ পেলে তাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলা হয়।

নিউরোগ্লাইকোপেনিক চিহ্ন

  • মাথাব্যাথা
  • বিহ্বলতা ভাব
  • চোখের দৃষ্টির গোলমাল
  • আচরণগত অস্বাভাবিকতা
  • তন্দ্রাচ্ছন্নভাব
  • খিঁচুনি
  • অচেতনাবস্থা

এড্রেনার্জিক চিহ্ন

  • ঘামতে থাকা
  • বুক ধড়ফড়ানি
  • কাঁপতে থাকা
  • খেপে যাওয়া
  • ক্ষুধা লাগা
চিহ্ন সমূহ

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার মাত্রানুযায়ী লক্ষণ

কম হাইপোগ্লাইসেমিয়া

মাঝারী হাইপোগ্লাইসেমিয়া

তীব্র হাইপোগ্লাইসেমিয়া

এড্রেনার্জিক চিহ্ন
  • ঘামতে থাকা
  • বুক ধড়ফড়ানি
  • কাঁপতে থাকা
  • খেপে যাওয়া
  • ক্ষুধা লাগা

 

  • ঘামতে থাকা
  • বুক ধড়ফড়ানি
  • কাঁপতে থাকা
  • খেপে যাওয়া
  • ক্ষুধা লাগা

 

  • অনুপস্থিত
নিউরোগ্লাইকোপেনিক চিহ্ন
  • অনুপস্থিত
  • মাথাব্যাথা
  • বিহ্বলতা ভাব
  • চোখের দৃষ্টির গোলমাল
  • আচরণগত অস্বাভাবিকতা
  • তন্দ্রাচ্ছন্নভাব
  • খিঁচুনি
  • অচেতনাবস্থা

 

 

 

অনবগত (Unaware) হাইপোগ্লাইসেমিয়াঃ অনেকদিন যাবত ডায়াবেটিস থাকলে, অটোনোমিক নার্ভের দুর্বলতা থাকলে, নন-সিলেক্টিভ বিটা-ব্লকার জাতীয় ঔষধ খেলে বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অতিমাত্রায় কড়াকড়ি করলে অনেকের এড্রেনার্জিক চিহ্নগুলো প্রকাশ পায় না। একে অনবগত (Unaware) হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলে। অর্থাৎ, হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলেও বুঝতে পারেন না।

নৈশকালীন (Nocturnal) হাইপোগ্লাইসেমিয়াঃ কোন কোন ডায়াবেটিস রোগীর রাতে ঘুমের মধ্যে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়। সাধারনতঃ রাত ২টা – ৪টার মধ্যে ঘটে। রোগীর পাশে কেউ থাকলে সে রোগীর কাঁপুনি বা ঘেমে যাওয়া টের পায়। কখনও কখনও সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর রোগীর মাথাব্যাথা, মাথা ঘোরা, রাতের কথা ভুলে যাওয়া বা বিহ্বলতা ভাব দেখা দেয়।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার কারনঃ

ডায়াবেটিস রোগীর সাধারনতঃ নিম্নলিখিত কারনে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ঃ

  • খুব বেশী মাত্রায় ইনসুলিন নিলে
  • বেশী মাত্রায় ইনসুলিন নিঃসরন বর্ধক (Secretagogues) ট্যাবলেট খেলে
  • সময়মত খাবার না খেলে বা কোন বেলার খাবার না খেলে
  • স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত সময় ব্যায়াম করলে
  • এলকোহলের আসক্তি থাকলে
  • কিডনী বা লিভারের তীব্র অস্বাভাবিকতা থাকলে

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার চিকিৎসাঃ

কম ও মাঝারী হাইপোগ্লাইসেমিয়াঃ

এক্ষেত্রে রোগী নিজেই বা পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসা করতে পারেন। সাধারনতঃ ১৫ গ্রাম গ্লুকোজ বা ১ গ্লাস ফলের জুস বা কয়েক চামচ চিনির পানি পান করলে সেরে যায়। যদি কোন বেলার নাস্তা বা খাবার বাদ পড়ে থাকে তাহলে তা খেয়ে নিতে হবে। রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ৫.৫ মিলিমোল/লিটার হলে রোগী বিপদমুক্ত হবে। না হলে ১৫ মিনিট পর পর উপরোক্ত চিকিৎসা দিতে হবে। যারা ইনসুলিন নেন তারা এই চিকিৎসায় দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যান, যারা ইনসুলিন নিঃসরন বর্ধক ট্যাবলেট খান তাদের তুলনায়। বার বার হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করা উচিৎ। হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ঔষধ বা ইনসুলিনের ডোজ পুনঃনির্ধারণ করতে হবে।

তীব্র হাইপোগ্লাইসেমিয়াঃ

তীব্র হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় রোগী সাধারনতঃ স্বল্প জ্ঞান বা অজ্ঞান হয়ে যান। গ্লুকমিটার দিয়ে আঙ্গুল থেকে রক্ত পরীক্ষা করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে বাসায় কোন চিকিৎসা করার সুযোগ থাকে না।

অনবগত (Unaware) হাইপোগ্লাইসেমিয়াঃ

নিয়মিত ও ঘন ঘন রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করে এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা ও ঔষধের ডোজ পরিবর্তন করে তীব্র হাইপোগ্লাইসেমিয়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

নৈশকালীন (Nocturnal) হাইপোগ্লাইসেমিয়াঃ

রাতের ইনসুলিনের ডোজ কমাতে হবে। সম্ভব হলে রাতের খাবারের আগে গ্লুকোজ পরীক্ষা করে ইনসুলিন নিতে হবে।

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার রোগীদের হাইপোগ্লাইসেমিয়া সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে হাইপোগ্লাইসেমিয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

 

ডাঃ এম. মঞ্জুর আহমেদ (সজীব)

এমবিবিএস (সিইউ); পিজিটি (সার্জারী); সিসিডি (বারডেম); ইডিসি (বারডেম)

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি স্বীকৃত ডায়াবেটিস ও ডায়াবেটিক ফুট চিকিৎসক

(ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষন প্রাপ্ত)