হাইপারগ্লাইসেমিয়া

ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অস্বাভাবিকরকম বেড়ে যাওয়াকে হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলা হয়। সাধারনত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ১১.১ মিলিমোল/লিটার বা তার বেশী হলে তাকে হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বেশী (১৫-২০ মিলিমোল/লিটার) না হলে সাধারনত উপসর্গ দেখা দেয় না। ডায়াবেটিক রোগীর দীর্ঘকালীন জটিলতা দেখা দেয় মূলত হাইপারগ্লাইসেমিয়ার জন্য।

কারও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ করে ৮-১৫ মিলিমোল/লিটার বা তার উপর উঠে গেলে তাকে তীব্র হাইপারগ্লাইসেমিয়া (একিউট হাইপারগ্লাইসেমিয়া) বলে। গ্লুকোমিটার দিয়ে ঘরে বসেই তা পরীক্ষা করা যায়।

রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে বা হাইপারগ্লাইসেমিয়া হলে হাঁটা বা ব্যায়ামের পরিমান বাড়িয়ে, খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে, ঔষধ খেয়ে বা ইনসুলিন নিয়ে যে কোন ভাবেই হোক রক্তের গ্লুকোজ কমাতে হবে তা না হলে রক্তে কিটোন বডি (কিটো এসিড) বেড়ে গিয়ে প্রশ্রাবে কিটো এসিড চলে আসবে। প্রশ্রাবে কিটো এসিড আসা মানে রোগী তীব্র হাইপারগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। এতে রোগীর জীবন বিপন্ন হবার সম্ভাবনা থাকে।

কারও রক্তে সবসময় গ্লুকোজের মাত্রা ৮ মিলিমোলের উপর থাকাকে দীর্ঘস্থায়ী হাইপারগ্লাইসেমিয়া (ক্রনিক হাইপারগ্লাইসেমিয়া) বলে। দীর্ঘস্থায়ী হাইপারগ্লাইসেমিয়া রক্তনালী এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি সাধন করে এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি করে। দীর্ঘস্থায়ী হাইপারগ্লাইসেমিয়া গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (এইচবিএ১সি) পরীক্ষার মাধ্যমে পরিমাপ করা যায়।

হাইপারগ্লাইসেমিয়া শুধুমাত্র ডায়াবেটিস রোগীর বেলায় ঘটবে তা নয়, ডায়াবেটিস ছাড়াও হাইপারগ্লাইসেমিয়া হতে পারে যেমন- কিছু কিছু ঔষধ এর কারনে (স্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ, বিটা ব্লকার, এপিনেফ্রিন, থায়াজাইড ডাই-ইউরেটিকস, নিয়াসিন, পেন্টামিডিন, কোন কোন এন্টি-সাইকোটিক ড্রাগ ইত্যাদি), কোন কোন রোগের কারনে (যেমন-ব্রেইনের স্ট্রোক, হার্টের মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন, থাইরয়েড এর রোগ, পিটুইটারীর রোগ, প্যানক্রিয়াসের রোগ ইত্যাদি), মেজর সার্জারীর ফলে অস্থায়ীভাবে গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধি হতে পারে।

খাওয়ার আগে ও পড়ে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরিবর্তিত হয়। ডায়াবেটিস রোগীর সাধারনত দুই সময়ে হাইপারগ্লাইসেমিয়া হয়- ফাষ্টিং হাইপারগ্লাইসেমিয়া এবং পোষ্ট প্র্যানডিয়াল হাইপারগ্লাইসেমিয়া।

ফাষ্টিং হাইপারগ্লাইসেমিয়াঃ
সকালে নাস্তার আগে (খালি পেটে) রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা সবসময় ৭ মিলিমোল/লিটার এর উপরে থাকাকে ফাষ্টিং হাইপারগ্লাইসেমিয়া বা অভুক্ত হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলে।

পোষ্ট প্র্যানডিয়াল হাইপারগ্লাইসেমিয়াঃ
খাদ্য গ্রহণের পর রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা সবসময় ১০ মিলিমোল/লিটার এর উপরে থাকাকে পোষ্ট প্র্যানডিয়াল হাইপারগ্লাইসেমিয়া বা খাদ্য গ্রহণ পরবর্তী হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলে। নন-ডায়াবেটিক ব্যক্তিরও খাদ্য গ্রহণের পর রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ১০ মিলিমোল/লিটার এর উপরে উঠে যেতে পারে, তবে দুয়েক ঘন্টার মধ্যে তা আবার ৮ মিলিমোল/লিটার এর নীচে নেমে আসে। কিন্তু ডায়াবেটিক রোগীর বেলায় এটা না নামলে তাকে পোষ্ট প্র্যানডিয়াল হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলা হবে।

কোন কোন রোগীর সারাদিন ডায়াবেটিস বেশ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় কিন্তু ফাষ্টিং হাইপারগ্লাইসেমিয়া থাকে। তাদের ক্ষেত্রে গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (এইচবিএ১সি) খুব বেশী বেড়ে যায়। এই ধরণের রোগীদের পরবর্তীতে ডায়াবেটিক জটিলতা বেশী হয়।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনের লক্ষ্যমাত্রাঃ
সকালের নাস্তার আগে (খালি পেটে) রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ৬.১ মিলিমোল/লিটার (১১০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার) এর নীচে, খাওয়ার পরে ৮ মিলিমোল/লিটার (১৪৫ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার) এর নীচে রাখতে হবে। গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন (এইচবিএ১সি) ৭% এর নীচে রাখতে হবে। লো ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (এলডিএল কোলেস্টেরল) ১০০ এর নীচে, হাই ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (এইচডিএল) কোলেস্টেরল ৪০ এর উপরে, ট্রাইগ্লিসারাইড (টিজি) ১৫০ এর নীচে, রক্তচাপ (বিপি) ১৩০/৮০ এর নীচে রাখতে হবে। বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ২৫ কেজি/বর্গমিটার এর নীচে রাখতে হবে।

ডায়াবেটিস রোগীর হাইপারগ্লাইসেমিয়ার কারনঃ
 ডায়াবেটিসের মুখে খাওয়ার ঔষধ বা ইনসুলিনের ডোজ বাদ পড়লে বা ডোজ কম হলে
 শর্করা/কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য অতিরিক্ত গ্রহণের ফলে
 শরীরে বিভিন্ন ধরণের ইনফেকশনের ফলে
 শারীরিক অসুস্থ্যতার কারণে
 বর্ধিত শারীরিক বা মানসিক চাপের ফলে
 স্বাভাবিক কাজকর্ম এবং ব্যায়াম না করার ফলে

হাইপারগ্লাইসেমিয়ার প্রাথমিক লক্ষণঃ
 অতিরিক্ত তৃষ্ণা লাগা বা গলা শুকানো
 মাথাব্যাথা করা
 কোন কিছুতে মনোযোগহীনতা
 ঝাপসা দৃষ্টি
 ঘন ঘন মূত্রত্যাগ
 ক্লান্তি (দুর্বল, ক্লান্ত অনুভূতি)
 ওজন কমে যাওয়া
 সবসময় রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ১০ মিলিমোল/লিটার এর উপরে থাকা

দীর্ঘস্থায়ী হাইপারগ্লাইসেমিয়ার ক্ষতিঃ

 যোনিপথে (মহিলাদের) এবং ত্বকে (সবার) সংক্রমণ
 ক্ষতস্থান ধীরগতিতে শুকানো
 দৃষ্টি শক্তি কমে যাওয়া
 নার্ভসমূহ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কারণে- অসংবেদী পা, পায়ের লোম পড়ে যাওয়া, কোন কোন পুরুষের পৌরুষত্ব কমে যাওয়া ইত্যাদি
 কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া থাকা
 চোখ, রক্তনালী বা কিডনির ক্ষতি
 হৃদরোগ ও স্ট্রোক এর ঝুঁকি বৃদ্ধি

চিকিৎসাঃ
১। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট খাদ্য তালিকা মেনে চলুন
২। নিয়মিত স্বাভাবিক কাজকর্ম, হাঁটা ও ব্যায়াম চালিয়ে যান
৩। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট ডোজ মতো ডায়াবেটিসের ঔষধ খেতে হবে বা ইনসুলিন নিতে হবে। কোন ভাবেই চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া নিজে নিজে ঔষধ বা ইনসুলিন বাদ দেওয়া বা ডোজ কমানো যাবে না
৪। শর্করা/কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার পরিমানের বেশী খাবেন না
৫। অপ্রয়োজনীয় ও অবেলার খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন (যেমন- যখন তখন চা-বিস্কুট, সিঙ্গারা-সমুচা-ডালপুরী-মিষ্টি ইত্যাদি)
৬। প্রতিমাসে কমপক্ষে একবার আপনার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন
৭। বাসায় গ্লুকোমিটার রাখুন ও ব্যবহার করতে শিখুন


তীব্র হাইপারগ্লাইসেমিয়ার বিপদঃ

সাধারনত দুই ভাবে তীব্র হাইপারগ্লাইসেমিয়া প্রকাশ পায়ঃ
১। ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ)
২। হাইপার অসমোলার নন কিটোটিক কোমা (এইচওএনকে) / হাইপার অসমোলার হাইপার গ্লাইসেমিক স্টেট (এইচএইচএস)

ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ)
ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ) হলো ডায়াবেটিস রোগীর সম্ভাব্য জীবনের হুমকি স্বরূপ একটি জটিলতা। এটি প্রধানত টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে ঘটে থাকে, তবে কোন কোন ক্ষেত্রে টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীর বেলায়ও হতে পারে। শরীরে যখন ইনসুলিনের ঘাটতি দেখা দেয় তখন গ্লুকোজ থেকে শক্তি উৎপাদন না হয়ে ফ্যাটি এসিড ভেঙ্গে শক্তি উৎপাদন হয়। এই চক্রে ফ্যাটি এসিড ভেঙ্গে কিটো এসিড সৃষ্টি হয়। রক্তের কিটো এসিড প্রশ্রাবের সাথে বের হতে থাকে। কিটো এসিডের জন্যই বিভিন্ন মারাত্মক উপসর্গ দেখা দেয়।

ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ) এর ক্ষেত্রে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা সাধারনত ১৬ মিলিমোল/লিটার এর বেশী থাকে। গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্ত পরীক্ষা করে সাথে সাথেই এটা জেনে নেওয়া সম্ভব।

লক্ষনঃ বমি ভাব, কফি রঙ্গের বমি, তীব্র পানি পিপাসা, প্রচুর প্রশ্রাব হওয়া, পেটের ব্যাথা, ঘন ঘন গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস, বিভ্রান্তি ভাব, তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব, অসাড়তা, অচেতনাবস্থা, পানি শুন্যতা, দ্রুত গতির পালস্, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং প্রশ্রাবে বিশেষ গন্ধ পাওয়া এই রোগের লক্ষণ। তবে সবার ক্ষেত্রে একই লক্ষণ প্রকাশ নাও পেতে পারে।

চিকিৎসাঃ
ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ) একটি মেডিকেল ইমারজেন্সি। ডায়াবেটিস রোগীর এই ধরণের লক্ষণ দেখা দিলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে দ্রুত কার্যকরী ইনসুলিন, সোডিয়াম যুক্ত স্যালাইন, পটাসিয়াম ও বাইকার্বনেট দিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। কোন অবস্থায়ই বাসায় বা চেম্বারে চিকিৎসা দেওয়া যাবে না। দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা দিতে না পারলে রোগীর ব্রেইনে পানি জমে যেতে পারে। এই অবস্থা থেকে রোগীকে ফিরিয়ে আনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।

হাইপার অসমোলার নন-কিটোটিক কোমা (এইচওএনকে) / হাইপারঅসমোলার হাইপারগ্লাইসেমিক স্টেট (এইচএইচএস)
এটি হলো ডায়াবেটিস রোগীর তীব্র হাইপারগ্লাইসেমিয়া জনিত একটি জটিলতা। এটি মূলত টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। উচ্চ মাত্রার গ্লুকোজের কারণে তীব্র পানি শুন্যতা দেখা দেয়। রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যায়, রোগী অচেতন হয়ে যায় এবং দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা শুরু করতে না পারলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই ক্ষেত্রে রক্ত ও প্রশ্রাবে কিটো এসিডের মাত্রা ডায়াবেটিক কিটোএসিডোসিস (ডিকেএ) এর মতো তেমন বেশী বৃদ্ধি পায় না।

হাইপার অসমোলার নন-কিটোটিক কোমা (এইচওএনকে) / হাইপারঅসমোলার হাইপারগ্লাইসেমিক স্টেট (এইচএইচএস) এর ক্ষেত্রে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা সাধারনত ৩৩ মিলিমোল/লিটার এর বেশী থাকে। গ্লুকোমিটার দিয়ে তাৎক্ষনিক ভাবেই তা জেনে নেওয়া যায়।

লক্ষনঃ মানসিক ভারসাম্য হারানো, নড়বড়ে অবস্থা, বিষণ্ণতা, কম্পন, পেশীতে টান পড়া, রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি।

চিকিৎসাঃ
হাইপার অসমোলার নন-কিটোটিক কোমা (এইচওএনকে) / হাইপারঅসমোলার হাইপারগ্লাইসেমিক স্টেট (এইচএইচএস) অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস রোগীর জন্য আরও একটি মেডিকেল ইমারজেন্সি। ডায়াবেটিস রোগীর এই ধরণের লক্ষণ দেখা দিলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে দ্রুত কার্যকরী ইনসুলিন, সোডিয়াম যুক্ত স্যালাইন ও রক্তের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ইলেক্ট্রোলাইট দিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। কোন অবস্থায়ই বাসায় বা চেম্বারে চিকিৎসা দেওয়া যাবে না। দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা দিতে না পারলে রোগীকে বাঁচানোর সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

 

ডাঃ এম. মঞ্জুর আহমেদ (সজীব)

এমবিবিএস (সিইউ); পিজিটি (সার্জারী); সিসিডি (বারডেম); ইডিসি (বারডেম)

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি স্বীকৃত ডায়াবেটিস ও ডায়াবেটিক ফুট চিকিৎসক

(ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষন প্রাপ্ত)